ফাইল ছবি
লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ যাওয়ার পথে নৌকা ডুবিতে প্রাণহানি ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেও এই প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না।
অবৈধ পথে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপ যাওয়ার ক্ষেত্রে সংঘাতময় তেলসমৃৃদ্ধ লিবিয়া এখন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। আমাদের দেশের মানব পাচারকারীরাও অবৈধ পথে ইউরোপ পাঠানোর ক্ষেত্রে এই রুট ব্যবহার করে থাকে। দেশটির মানবপাচারকারী চক্র দশকের পর দশক ধরে অবৈধ অভিবাসীদের কাছ থেকে টাকার জন্য নির্যাতন, বাধ্যতামূলক শ্রম, বন্দি এমনকি খুন করে গণকবর দেওয়ার মতো নিষ্ঠুর কাজ করে আসছে। আরব নিউজ লিবিয়ায় গণকরব এবং বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলাদেশি কয়েকজনের বরাত দিয়ে এই সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
এতো প্রাণহানির পরও এই বিপজ্জনক পথে অনেকে কেন ইউরোপ যেতে চাইছে এই বিষয়ে আমরা ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও উন্নত বিশে^ কর্মী প্রেরণকারী রিক্রুটিং এজন্সিগুলোর সংগঠন রাবিড সভাপতি আরিফুর রহমানের কাছে চাই। তিনি বলেন,‘অবৈধভাবে ইউরোপ যাওয়ার পথে এইভাবে প্রাণ হারানোর ঘটনা দুঃখজনক। এটা বন্ধ করার জন্য বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে। মানুষ কেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এতো টাকা খরচ করে অবৈধ পথে যেতে চাইছে সেই কারণ খুঁজে বের করেতে হবে।
বৈধ পথে যাওয়ার ক্ষেত্রে যেসব প্রতিবন্ধকতা আছে সেগুলো দূর করতে হবে। এইক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা হচ্ছে দীর্ঘসূত্রিতা, এই দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অনেকে অল্প সময়ে বিদেশ যাওয়ার জন্য অবৈধ পথে পা বাড়ান।’
তিনি বলেন,‘ইউরোপের দেশগুলোতে যারা যেতে চান তাদের অবশ্যই প্রস্তুতি থাকতে হবে; বেশিরভাগের মধ্যে কোন ধরনের কাজ না শিখে এবং ভাষা না জেনে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা আছে। যে কারণে তারা বৈধ পথের পরিবর্তে অবৈধ পথে যেতে চায়।’
তিনি বলেন,‘নিয়োগকারী কোম্পানির চাহিদা অনুযায়ী কোন একটা বিশেষ কাজের দক্ষতা অর্জন এবং ভাষা না শিখে যাওয়ার কারণে অনেকে কাজে যোগ না দিয়ে পালিয়ে যায়, এই কারণে একের পর এক মার্কেটগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, ভিসা রেশিও কমে যাচ্ছে। এই জন্য কাজের ক্ষেত্র থেকে যাতে পালিয়ে যেতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে।’
আরিফুর রহমান বলেন,‘এই ধরনের দুঃখজনক পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে বিদেশ যাওয়া নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া বায়রা, বিএমইটি ও রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে সম্মিলিতভাবে সচেতনতামূলক কার্যক্রম নিতে হবে যাতে করে বিদেশ গমনেচ্ছুরা অবৈধ পথে না গিয়ে কোন একটা বিশেষ কাজ ও ভাষা শিখে বৈধ পথে বিদেশ যায়।’
আরব নিউজ : আরব নিউজের এ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ফেব্রুয়ারি মাসের গোড়ার দিকে লিবিয়ার কর্তৃপক্ষ দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় মরু এলাকায় অবস্থিত দুইটা গণকবর থেকে ৫০টি মৃতদেহ উদ্ধার করেছে। কর্তৃপক্ষ বলেছে, লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার ক্ষেত্রে এটা হচ্ছে সর্বশেষ ট্রেজেডি।
আরব নিউজে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির কুফরা সিটিেিত অবস্থিত গণকরব থেকে ৯টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। লিবিয়ার পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলীয় এলাকায় অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করে এমন একটি চেরিটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে আল- আবরিন। তারা বলছে উদ্ধার করা লাশ দেখে তাদের মনে হয়েছে অনেককে হত্যা করা হয়েছে গুলি করে। কুফরার আর একটা পৃথক গণকবর থেকে কমপক্ষে ৩০টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। পালিয়ে আসা একজনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ওই গণকরবে কমপক্ষে ৭০ জনের লাশ দাফন করা হয়েছে।
আরব ইনউজের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লিবিয়ায় গণকবরের বিষয় নতুন কিছু নয়। ত্রিফলি থেকে ২২০ মাইল দক্ষিণে শুয়ারিফ অঞ্চল থেকে গতবছর কম করে ৬৫ জন অভিবাসীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। লিবিয়া হচ্ছে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপ যেতে ইচ্ছুক অভিবাসীদের জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পয়েন্ট।
২০১১সালে মুহাম্মর গাদ্দাফির পতনের পর তেল সমৃদ্ধ দেশটির পূর্ব ও পশ্চিম অংশ মিলিশিয়া ও বিদেশি মদতপুষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বী সরকার দ্বারা শাসিত হয়ে আসছে।
এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে চাদ, নাইজেরিয়া, সুদান, মিশর আলজেরিয়া এবং নিউনেশিয়াসহ ছয়টি দেশের সীমান্ত জুড়ে অভিবাসীদের পাচারের কাজে যুক্ত থেকে মানবপাচারকারী চক্র এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সুবিধা পেয়ে আসছে।
বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড: বিজন্সে স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে এইভাবে বিষয়টা তুলে ধরা হয়।
নৌকার গরম জ্বালানিতে ইয়াসিন হাওলাদারের পায়ের চামড়া পুড়ে গেছে। তারপর অজ্ঞান হয়ে পড়ে। ভূমধ্যসাগরের মধ্য দিয়ে ইতালিতে পৌঁছানোর চেষ্টাকারী একশ জনেরও বেশি অভিবাসীর মধ্যে ইয়াসিন একজন।
বেঁচে ফিরে আসা ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, রোমান হাওলাদার নামে আরেক অভিবাসীও ওই নৌকায় আরো কয়েকজন বাংলাদেশির সঙ্গে ছিলেন।
তিনি বলেছেন নৌকাটি ডুবতে শুরু করলে, তারা উদ্ধারের জন্য লিবিয়ান কোস্ট গার্ডের কাছে পৌঁছায়, কিন্তু তাদের আবেদন উপেক্ষা করা হয়। এরপর তারা তিউনিসিয়ান কোস্ট গার্ডের সাথে যোগাযোগ করে, তারাও সাহায্য করতে অস্বীকার করে। সমুদ্রে আসন্ন মৃত্যুর মুহুর্তে, তারা তিউনিসিয়ার একটি গ্যাস অনুসন্ধানকারী জাহাজের মুখোমুখি হয়। নাবিকরা তাদের উদ্ধার করে তীরে নিয়ে আসে এবং পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে।
এরপর তিউনিসিয়ার পুলিশ অভিবাসীদের বিভিন্ন দলে ভাগ করে এবং বেশ কয়েকটি বাসে তুলে দেয়। ইয়াসিন এবং রোমান সহ একটি দল আলজেরিয়ার সীমান্তের কাছে মরুভূমিতে পরিত্যক্ত হয়েছিল। দলে প্রায় ২৫ বাংলাদেশি ছিল।
বাংলাদেশি অভিবাসীরা আলজেরিয়ার সীমান্তের দিকে মাইলের পর মাইল হাঁটতে থাকে এবং ইয়াসিনকে সঙ্গে নিয়ে যায়। এক পর্যায়ে, আলজেরিয়ান পুলিশ তাদের খুঁজে পায়, কিন্তু তারা ইয়াসিনকে হাসপাতালে ভর্তী করে এবং রোমানসহ অন্যদের জেলে পাঠিয়ে দেয়।
রোমান বলেন,‘কিন্তু তারা বাকিদের নাইজার সীমান্ত এলাকায় নিয়ে যায় এবং সেখানে রেখে যায়।’ এটি আদর্শ অনুশীলন। প্রতিটি দেশ অভিবাসীদের সীমান্তে ঠেলে দেয়, এবং চক্রটি চলতে থাকে।’
এই গ্রুপের কেউ কেউ রোমান, জাকির এবং ইয়াসিনের আগে বাংলাদেশে ফিরে আসলেও, অন্যরা নিখোঁজ রয়েছে, তাদের পরিবার পাঁচ মাস পরেও তাদের সন্ধান করছে।
ব্র্যাক মাইগ্রেশনের সহযোগিতায় বাংলাদেশ সরকার উদ্ধারের আগে এই তিনজন পাঁচ মাসের বেশি কারাগারে কাটিয়েছেন। এ পর্বে আলজেরিয়া থেকে পাঁচ বাংলাদেশিকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
অনেক বাংলাদেশী অভিবাসী শ্রমিকের জন্য লিবিয়া একটি প্রধান ট্রানজিট পয়েন্ট, যারা ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করে প্রায়ই এই প্রক্রিয়ায় তাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে।
উদাহরণস্বরূপ, গত মাসে, লিবিয়ার উপকূলে ২০ টিরও বেশি অভিবাসী শ্রমিকের মৃতদেহ পাওয়া গেছে, যাদের বেশিরভাগই বাংলাদেশি বলে শনাক্ত করা হয়েছে। মাদারীপুর, অন্যতম প্রধান জেলা যেখান থেকে সবচেয়ে বেশি অভিবাসীরা এই বিপজ্জনক যাত্রা শুরু করে, আবারও লিবিয়ার কাছে তার কয়েক ডজন লোককে হারিয়েছে।
ইতালি পৌঁছাতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন বা সেখান থেকে জীবিত ফিরে এসেছে এমন বাংলাদেশিদের কোনো সুনির্দিষ্ট তালিকা নেই। তবে, মাদারীপুরের একজন প্রাক্তন পুলিশ সুপার বলেছেন যে শুধুমাত্র জেলা থেকে একশ জনেরও বেশি বাংলাদেশি এই প্রচেষ্টায় মারা গেছে।
মারা যাওয়ার আগে বা ইতালিতে পৌঁছানোর আগে, এই অভিবাসী শ্রমিকদের বেশিরভাগই নির্মম নির্যাতন সহ্য করে, লিবিয়ার অপরাধীদের দ্বারা পাচার করা হয়, একাধিকবার বিক্রি করা হয় এবং বিপুল অর্থের জন্য চাঁদাবাজি করা হয়। তাদের মধ্যে আলামিন মোল্লাও ছিলেন। তার বড় ভাই জামিল মোল্লা বলেন, ‘তারা তাকে মারধর ও নির্যাতন করতে থাকে যতক্ষণ না আমরা তাদের টাকা পাঠাই, আমরা যা খুশি বিক্রি করে দিই।’
জামিল বলেন, ‘তাকে নৌকায় তোলার জন্য আমরা ৩৪ লাখ টাকা খরচ করেছি। প্রাথমিকভাবে, তারা তাকে ইতালিতে পৌঁছাতে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ১২ লাখ টাকা নেয়। কিন্তু পরে এজেন্ট আমাদের কাছ থেকে আরও টাকা আদায়ের জন্য তাকে মাফিয়াদের কাছে বিক্রি করে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত আমরা তার মুক্তির জন্য ৩৪ লাখ টাকা দিয়েছি।
রোমান ও ইয়াসিন দুজনেই জানান, তাদের এজেন্ট ছিলেন খালেদা নামে এক নারী, যিনি তাদের গ্রামে থাকেন। তারা দাবি করেছিল যে মাফিয়া এজেন্টদের কাছে তাদের বিক্রি করার জন্য তিনি দায়ী ছিলেন, যার ফলে তাদের প্রচুর অর্থ প্রদান করতে হয়েছিল। নৌকায় ওঠার আগেই তারা দুজনেই ২৫ লাখ টাকার বেশি খরচ করেন।
ইয়াসিন বলেন, ‘আমরা যখন খালেদাকে আমাদের কষ্টের কথা জিজ্ঞেস করি, তখন তিনি শুধু আমাদের বলেছিলেন, ‘তোমরা যা পারো করতে পারো।’ আমরা খালেদাকে ফোন করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু তাকে পাইনি।
ইতালিতে সমুদ্রপথের পাশাপাশি, বাংলাদেশি অভিবাসীরা আলজেরিয়া এবং মরক্কো হয়ে স্পেনে মরুভূমির পথ ব্যবহার করে থাকে। আলজেরিয়া থেকে প্রত্যাবাসিত পাঁচ বাংলাদেশির মধ্যে দুজন এই মরুভূমির পথ ধরেছিল।
তাদের একজন শেরপুরের মোজাম্মেল হক। তিনি বলেন, ‘ভুমধ্যসাগর হয়ে ইতালিতে পৌঁছানোর চেষ্টা ব্যর্থ হলে আমাকে লিবিয়ায় বিক্রি করে নির্যাতন করা হয়। তারপর আমি শুনি যে আমরা মরক্কো হয়ে স্পেনে যেতে পারি।
তিনি একাই মরুভূমির যাত্রা শুরু করেছি কিন্তু মরক্কো পৌঁছানোর আগেই আলজেরিয়ার পুলিশের হাতে ধরা পড়েন এবং কয়েক মাস জেলে কাটান। তিনি বলেন, ‘আমি জানি না এর জন্য কাকে দায়ী করব। আমি ঋণের মধ্যে ডুবে আছি, এবং আমি কীভাবে তা পরিশোধ করব তা জানি না।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
খোকন দাস
সম্পাদক মন্ডলি
সৈয়দা পারভীন আক্তার
ফকরুদ্দীন কবীর আতিক
মোঃ ইলিয়াস হোসেন
মোঃ শাহাদাত হোসেন
পরিচালক মন্ডলি
ছিদ্দিকুর রহমান ভুঞ্রা (পরিচালক, ফিন্যান্স)
মোস্তাফিজুর রহমান (পরিচালক, পাবলিকেশন)
শান্ত দেব সাহা (পরিচালক, এইচ আর)
শাহরিয়ার হোসেন (পরিচালক, মার্কেটিং)
বার্তা সম্পাদক
মোঃ হাবীবুল্লাহ্
সিনিয়র রিপোর্টার
মোঃ জাকির হোসেন পাটওয়ারী
ভারপ্রাপ্ত প্রকাশক, আরিফুর রহমান কর্তৃক
ডা. নওয়াব আলী টাওয়ার, ২৪ পুরানা পল্টন, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
ফোনঃ +৮৮ ০১৭৩২ ৪১৭ ৫১৭
Email: [email protected]
©২০২৪ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || ProbasonNews.com